পার্সিয়ান ভূগর্ভস্থ পানি পরিবহন ব্যবস্থা

পার্সিয়ান সভ্যতা (ইরান) ছিল অতীতের সব থেকে সমৃদ্ধ সভ্যতা, যা প্রতিষ্ঠিত ছিল হাজার বছরের উপরে। ততকালীন সময়ে তাদের আধুনিকতা, শিল্পচর্চা এবং উদ্ভাবন বিশেষ করে স্থাপনার ক্ষেত্রে আমাদের হতবাক করতে আজও বিন্দু মাত্র কার্পন্ন করে না। নিচের ছবিতে যে গর্ত গুলি দেখতে পাচ্ছেন, এই গর্তগুলির বয়স ২,৭০০ বছরের অধিক। এগুলিকে বলা হয় "Qanat" অর্থাৎ "চ্যানেল"। কিসের চ্যানেল এগুলি? ততকালীন সময়ে ভূগভীরের পানি বা কোন ঝড়নার পানি চাষ এবং পান করার জন্য পানি শহরে নিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহৃত হত এই পানির চ্যানেল গুলি।


অতীতে তৈরি করা পানির এই চ্যানেল গুলি বেশ সফলতার সাথেই তা কাজ সাধন করেছে, আর এ কারনেই ততকালীন সময় মরুভূমির মাঝে গড়ে ওঠা পারসিয়ান সম্রাজ্য এতটা বেশি ধরে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল আর আয়তনে বিশাল আকার ধারন করতে পেরেছিল। এই চ্যানেল গুলি যে শুধু মাত্র পানি সরবরাহ করার কাজে ব্যবহৃত হত তা নয় বরং তা পানি ধরে রাখার কাজেও ব্যবহৃত হত। ২০০৭ সালে UNESCO এই চ্যানেল গুলিকে "World Heritage Site" হিসেবে ঘোষন করে।


চ্যানেল এর প্রথম স্থাপিত হয় প্রাচীন পার্সিয়ায়। কিন্তু এর বিস্তর ঘটেছিল বিশাল এলাকা জুড়ে। বর্তমান সময়ের মরোক্ক, আলজেরিয়া, লিবিয়া এবং আফগানিস্থানের মত শুষ্ক এলাকা জুড়ে ছিল এর বিস্তার। এই চ্যানেলের খনন কাজ শুরু করার প্রথম ধাপ ছিল, পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে মাটি খনন করা আর না সুরঙ্গ আকারে নেমে যেত মাটির গভীরে। আর ততক্ষন পর্যন্ত খনন করা হত যতক্ষন পর্যন্ত না মাটির নিচের পানির স্তর পর্যন্ত তা চলে যেত। এরপরে পানির স্তর থেকে আড়াআড়ি ভাবে আরেকটি সুরঙ্গ কাটা হত আর তা বেড় হয়ে যেত পাহারের বাইরে। তবে এই আড়াআড়ি সুরঙ্গ খনন করার সময় খেয়াল রাখা হত যাতে পানির উৎস থেকে আড়াআড়ি সুরঙ্গ যেন নিচের দিকে যায়, যাতে পানি সহজেই এই আড়াআড়ি সুরঙ্গ দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে। উপরের ছবিটি একটু খেয়াল করে দেখলেই বুঝে যাবেন।


আড়াআড়ি করা এই সুরঙ্গের উপর দিয়ে আবার খাড়া ভাবে সুরঙ্গ তৈরি করা হত যাতে মাঝ পথে পানি বাতাসের অভাবে আটকে না যায় বা মাঝপথেও যাতে পানি সংগ্রহ করা যায়। এই সুরঙ্গ তৈরিতে ততকালীন সময়ে বর্তমান সময়ে আবিষ্কৃত পদার্থ বিজ্ঞানের সফল প্রয়োগ খুঁজে পাওয়া যায়।

চ্যানেলটির স্থাপনা বেশ গভীরে থাকার কারনে পানির বাষ্পে পরিনত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায় এবং মরুভূমির প্রখর তাপের মধ্য দিয়ে পানির প্রবাহ সচল থাকে। এছাড়াও এই চ্যানেলের মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের বিশ্রাম নেবার জায়গা, পানি সংরক্ষন করার জন্য জলাধার এবং জলচক্র।

যেহেতু পানি মাটি ও নুড়ি পাথরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় তাই এই পানি বেশ ভাল মতই পরিষ্কার হয়ে যায়। আর তা এতটাই হয় যে নির্দিধায় তা পান করার যোগ্য। চ্যানেলের শেষ মাথায় পানি সংরক্ষন করার ব্যবস্থা করা থাকত। কেউ চাইলে সেখান থেকেও পানি সংরক্ষন করতে পারত বা পানি চাষ কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারতেন। তৎকালীন পার্সিয়ান সরকার এই চ্যানেলের মাধ্যমে পাহাড় থেকে শহর গুলিতে পানি সরবরাহ করতেন। এমন কি জনসাধারনের জন্য ব্যবহৃত শৈচাগারে পর্যন্ত পানি সরবরাহ করা হত। ধনী ব্যক্তিরা চাইলেই মূল চ্যানেল থেকে নিজেদের আলাদা ভাবে চ্যানেল তৈরি করে নিজেদের বাড়ি বা চাষাবাদের জমিতে পানি নিতে পারত। অবশ্য এর জন্য খরচ তারাই বহন করত কিন্তু জনসাধারনের জন্য যা কিছু করা হত তার খরচ সরকার বহন করত।


পানির এই চ্যানেলের মত আরেকটি বিষ্ময়কর স্থাপনার নাম "আবু আনবার" অর্থাৎ "জনসাধারনের কূপ"। এই কূপ গুলির এমন ভাবে তৈরি করা হত যাতে কূপের মধ্যে বাতাস প্রবাহ থাকে, যাতে পানি সব সময় ঠান্ডা থাকে। উপরের ছবিটি দেখলে বুঝে যাবেন স্থাপনাটি কতটা নিখুঁত আর জটিল ভাবে তৈরি করা হত। লম্বা টাওয়ার গুলির মধ্য দিয়ে বাতাস ঢুকে আর বের হয়। মধ্যের গম্বুজের মধ্য দিয়ে বাতাস ঘুরপাক খায়। যার ফলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনে থাকে।

আশ্চর্যের বিষয় কি জানেন? পানি সবরাহের এই ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত কাজ করছে এবং বর্তমানে ৪০,০০০ পরিমান জনসাধারনকে পানি সরবরাহ করে যাচ্ছে।


লেখকঃ জানা অজানার পথিক।

৩টি মন্তব্য:

জানার কোন অন্ত নাই, জানার ইচ্ছা বৃথা তাই, ভেবে যদি জানার ইচ্ছাকে দমন করে রাখা হয় তবে সে জীবনের কোন অর্থ নাই। কিন্তু সব জানতে হবে এমন কোন কথা নাই, তবে জানার ইচ্ছা থাকা চাই। আমাদের এই জানা জানির ইচ্ছকে সূত্র করে, আমাদের ছোট্ট একটি প্রয়াস ❝আমি জানতে চাই❞। আমাদের জানতে চাওয়ার ইচ্ছা পুরনের লক্ষে কখনো জেনেছি মহাকাশ নিয়ে, কখনো জেনেছি সমুদ্র নিয়ে, কখনো ডুব দিয়েছি কৌতুক এর মাঝে, আবার ভয়ে কেঁপেছি ভুতের গল্প পড়ে, কখনোবা শিউরে উঠেছি কিছু মানুষের কার্যকলাপ জেনে। কখনো জেনেছি নতুন আবিষ্কারের কথা, আবার জেনেছি আদি ঐতিহ্যের কথা, এত সব কিছু করেছি শুধু জানতে চাওয়ার ইচ্ছা থেকে।

hybridknowledge.info hybridknowledge.info